নিবন্ধ ও সম্পাদকীয়

বনি কুরাইজা: হত্যাকাণ্ড নাকি রাষ্ট্রদ্রোহীর দণ্ড? (শেষ পর্ব)

28 Apr, 2018 Super Admin 811 ভিউ
বনি কুরাইজা: হত্যাকাণ্ড নাকি রাষ্ট্রদ্রোহীর দণ্ড? (শেষ পর্ব)

মোহাম্মদ আসাদ আলী

(পূর্ব প্রকাশের পর) বনি কুরাইজা গোত্রের এই যে রাষ্ট্রদ্রোহী চক্রান্ত, এর ভয়াবহতা কতখানি তা বুঝতে হবে। যেই মুহূর্তে প্রত্যেক গোত্র প্রশ্নহীন শর্তহীনভাবে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতকে শক্তিশালী করার কথা, সেই মুহূর্তে তারা চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলে শত্রুসেনার সাথে হাত মিলিয়ে যে পরিস্থিতির সূচনা করেছিল- তার পরিণতি কী হতে পারত? সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধ না করতে পেরে নিঃসন্দেহে হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষ মৃত্যুবরণ করত, যার মধ্যে নারী-শিশুও থাকত। আর তেমনটা হলে আজকে যারা তিনশ’ জন ইহুদি হত্যা নিয়ে অশ্রুবর্ষণ করেন, হাজার হাজার মুসলিম হত্যার ঘটনায় এক লাইন লেখারও প্রয়োজন বোধ করতেন না। পাঠকদের নিশ্চয়ই অজানা নয় ইহুদিরা অন্তত দুই হাজার বছর ধরে ইউরোপের নানা দেশে নির্যাতিত হয়েছে, গণহত্যার শিকার হয়েছে। খ্রিষ্টানরা সংঘবদ্ধভাবে ইহুদিদের বাড়িঘরে আক্রমণ করে তাদের গণহত্যা করেছে, মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, অবাধ লুটপাট চালিয়েছে, যেই হত্যালীলা বোঝাতে ইংরেজিতে একটি শব্দেরই জন্ম হয় ‘পোগরোম’। পোগরোমের সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে একজন খ্রিষ্টান রাষ্ট্রপ্রধান হিটলার ষাট লক্ষ ইহুদিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এই যে খ্রিষ্টানদের হাতে নিহত লক্ষ লক্ষ ইহুদি, কোনো এক রহস্যময় কারণে এদের জন্য ইসলামবিদ্বেষী লেখকদের কোনো মমতাবোধ জাগ্রত হয় না। এদের যারা হত্যা করল তাদের বিরুদ্ধে কলমের ডগায় প্রতিবাদের ফোয়ারা সৃষ্টি হয় না। তাদের দুঃখ কেবল ওই তিনশ’ জন ইহুদির জন্য যারা রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মৃতুদণ্ড ভোগ করে। এতেই বোঝা যায় মানবতার আড়ালে তাদের আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন। সেটা হলো আল্লাহর রসুলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। নিহত ইহুদির সংখ্যা যদি লক্ষাধিকও হয়, কিন্তু হত্যাকারী অন্য কেউ হয় তাহলে তাদের আপত্তি নেই।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আজকের দুনিয়াতেও ওই ধরনের অপরাধের কী শাস্তি দেওয়া হয়? কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করেন না। আমাদের দেশে ছিচল্লিশ বছর পরেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফাঁসিতে ঝোলানো হচ্ছে। সেই সাথে এ বিচার যুদ্ধের পরপরই হওয়া উচিত ছিল বলে আফসোস করা হচ্ছে। আল্লাহর রসুল যাদেরকে অতীতে একবার ক্ষমা করেছেন, আবার ক্ষমা করবেন কি নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের সুযোগ করে দেবার জন্য? অতীতে ক্ষমা করা হয়েছে বলেই রাষ্ট্রদ্রোহী চক্রান্তকে মামুলি বিষয় মনে করা হয়েছে, ধরেই নেওয়া হয়েছে যদি চক্রান্ত ভেস্তেও যায় প্রাণদণ্ড হবে না, বড়জোর নির্বাসিত করা হবে। এভাবে বারবার ক্ষমা পেতে থাকলে কোনো গোত্রই রসুলাল্লাহর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে দুশ্চিন্তাবোধ করত না। অথচ খন্দকের যুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক সাহায্য না পেলে ঘটনা ঘটত উল্টো। সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধে মুসলিম সৈন্যবাহিনী ব্যর্থ হত, আর ওইদিনই দুনিয়া থেকে ইসলামের নাম-গন্ধ মুছে যেত। আল্লাহর রসুল অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ট, দারিদ্র্য, অপমান, নির্যাতন আর লাঞ্ছনার বিনিময়ে একটি জাতি গঠনের পর সেই জাতিকে চোখের সামনে ধ্বংস হতে দেখতেন।

একটি জাতি তিনি গঠন করতে চেয়েছেন। তার জন্য নিজের গোত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন, তাঁর অনুসারীরা নিজেদের বাপ-ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, বদরে ওহুদে কত সাহাবী হাসতে হাসতে প্রাণত্যাগ করেছে! এত কোরবানির বিনিময়ে জাতি গঠিত হবার পর কোনো নেতাই ওই জাতির অস্তিত্বের প্রশ্নে যাকে হুমকি মনে করবেন তার সাথে আপস করবেন না। তিনি আল্লাহর সত্যনবী, তিনি কেবল মানুষকে শান্তি ও সুবিচারের গালভরা বাণী মুখস্থ করাতে আসেননি, তিনি শান্তি ও সুবিচার কায়েম করতে এসেছিলেন। সাধুদের পরিত্রাণ আর দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশ করতেই তার আগমন।

আল্লাহর রসুল বনি কুরাইজা গোত্রের সবার প্রাণদণ্ড কার্যকর করেননি, তবে যোদ্ধাদের মধ্যে অনেককে প্রাণ হারাতে হয়েছিল। সেই সংখ্যা নিয়েও মতভেদ আছে। সিরাতে যদিও ৭০০’র কথা বলা হয়েছে, হাদিসে তিনশ’র কথাও আছে। তবে এ নিয়ে সন্দেহ নেই যে, যদি রসুলাল্লাহ আবারও উদারতা দেখিয়ে ক্ষমা করে দিতেন বা পুরো গোত্রকে অন্য কোথাও চলে যাবার সুযোগ করে দিতেন তারা ঠিকই অন্যান্য ইহুদিদের জোটবদ্ধ করে আবারও মদীনাকে ধ্বংস করতে ফিরে আসত। এই কারণেই বিশ্বাসঘাতকদের সহজে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না, কিন্তু যদি কেউ ভেবে থাকেন ওরা নিছক অন্য ধর্মের হবার কারণেই বিদ্বেষপ্রসূত শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেটা ইতিহাসের প্রতি অন্যায় করা হবে। খন্দকের যুদ্ধের আগেও মুসলমানরা যুদ্ধবিজয় করেছে, পরেও বহু যুদ্ধ বিজয় করেছে, কয়টা গোত্রের পুরুষ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে? মক্কা বিজয়ের পর রসুলাল্লাহ যে ক্ষমার ঘোষণা দিবেন তা মক্কাবাসীও কি কল্পনা করতে পেরেছিল? পারেনি। ক্ষমার এমন নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন যে মহামানব তিনি তিনশ’ জন ইহুদির প্রতি রাগ সংবরণ করতে পারলেন না- তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি এত বড় শাস্তি হতে দিলেন কারণ এই শাস্তি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় তাঁর সামনে ছিল না। (সমাপ্ত)

মন্তব্য সমূহ (0)

বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আপনার মতামত দিন

জনপ্রিয় ট্যাগ
#মামলার অব্যাহতি #গোলটেবিল বৈঠক #হাইকোর্টের রায় #অপপ্রচার #muchleka #কোরবানি কখন কবুল হবে? #হেযবà§�ত তওহীদ #ইসলামি ইতিহাস #উগ্রবাদ #গুজব #নারী #পর্দা #প্রকৃত ইসলাম #প্রকৃত ইসলামের নারী #হেযবুত তওহীদ #হেযবুত তওহীদের নারী #ইসলাম #নোয়াখালীত #বকধার্মিকতা #মন্তব্য কলাম #মন্তব্য কলাম বাড়ছে বকধার্মিকতা #কারা সেই জান্নাতি ফেরকা? #জান্নাতি #জান্নাতি ফেরকা #মুস্তাফিজ শিহাব #চলমান সঙ্কট #মুখলেছুর রহমান সুমন #রাজনৈতিক ইসলাম #ধর্ম নিয়ে ঘৃণার রাজনীতি #রামমন্দির ও থার্ড টেম্পল #ইসলামের অপব্যাখ্যা #জাতি ভেঙে খানখান #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির #ধর্ম #পরিণাম জাতি ভেঙে খানখান #ফেরেশতা #মানুষ সৃষ্টির #মো’জেজা: কী কেন কীভাবে? #পহেলা বৈশাখ #সংস্কৃতির #সাংস্কৃতিক অঙ্গন #আমল #ঈমান #আদিবা ইসলাম #এমামুযযামান #রিয়াদুল হাসান #লা’নত নাকি পরীক্ষা #লানত #কাঁটাতারে ব্যর্থ #বিশ্বভ্রাতৃত্বের #মুসলিম #রোড টু ফিলিস্তিন #নামাজ #নামাজ কেন পড়ছেন? #মোহাম্মদ আসাদ আলী #ধর্মজীবিকা #ধর্মবিশ্বাসী #শিক্ষাব্যবস্থা #অশান্তি সৃষ্টির কারণ #এম আর হাসান #চরিত্রহীন নেতৃত্ব #বস্তুবাদী সভ্যতা #বাস্তব সমস্যা #মহানবীর (সা.) #দেশকে রক্ষা #বিশ্ব মুসলমান #মদিনার #রাকীব আল হাসান #মাননীয় এমাম #হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম #ইসলামের ইতিহাস #মো’মেনদের #দাজ্জাল #দাজ্জালকে চিনতে হবে #ধর্মব্যবসা #উম্মতে মোহাম্মাদি #তওহীদ #মো’জেজা: #মুসলিমরা আজ সংকটের সম্মুখীন #খলিফা #দীন প্রতিষ্ঠা #দীনের মূল ভিত্তি #লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ #সেরাতুল মোস্তাকিম #২৯ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী #civilized’ #deterrent #islam world #world #জীবনব্যবস্থা #প্রশ্ন উত্তর #প্রশ্নোত্তর #হেযবুত তওহীদের #hezbuttawheed #hossain mohammad salim #Resolving the Global Crisis #Students #ঐক্য ##MarathonHT #Marathon #lifestyle #ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান #workplace #religious extremists #democratic system #economic system #politics #Allah #Aqeedah of islam #God #Haj #Jihad #Kital #Prophet Muhammad #terrorism #কোরবানি #ত্যাগ #বজ্রশক্তি #সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা #সাক্ষাৎকার #হেযবুত তওহীদের বিজয় #রসুলুল্লাহর সুন্নাহ #দাসপ্রথার #জঙ্গিবাদ #আইয়্যামে জাহেলিয়াত #জেহাদ #দোয়া #সঠিক জীবন ব্যবস্থা #জ্ঞান #বাণী #ইমাম মাহদী #কবিতা #রাজনীতি #মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা #আশুরা #শহীদ #প্রকৃত ইসলামের মসজিদ #মসজিদে নারী #দাউদ খান পন্নী #ঔপনিবেশিক যুগ #সংগীত #স্বাধীনতা #খোলাফায়ে রাশেদীন #যোদ্ধাসুফি #স্বর্ণযুগের মোল্লাতন্ত্র #মানুষ সৃষ্টি #প্রকৃত ইসলামের বিয়ে #বাংলার সুলতানী যুগ #গণমাধ্যম #মহামান্য এমামুযযামানের জীবনবৃত্তান্ত #ইসলাম অর্থ #শান্তি #পাকিস্তান #দৈনিক বজ্রশক্তি #খেলাধুলা #আইনের উৎস #নির্বাচন #সংস্কৃতি #জ্ঞান-বিজ্ঞান #মহানবীর লড়াই #হজ #সাম্যবাদ ও ইসলাম #বাংলাদেশ #কোর’আন #শিক্ষা #নবুয়তপূর্ব জীবন #ইসলামবিদ্বেষী #ইতিহাস ও ইসলাম #চরমোনাই #ওমর (রা.) #তারেক বিন যিয়াদ #কর্মফল #পুঁজিবাদ #মার্কস #হারাম #সুফিবাদ #বাঙালি #মানবজীবন #মুসলিমদের ইতিহাস #প্রশ্ন #রাগ #আকিদা #কমিউনিজম #জান্নাত-জাহান্নাম #মণীষীদের জীবনী #মধ্যযুগীয় বর্বরতা #স্বর্ণযুগ #গণজোয়ার #গণপ্রতিরোধ #তওহীদী জনতা #কর্মজীবন #ইসলাম আবির্ভাব #ইসলামের বিস্তৃতি #অর্থনীতি #রিজিক #বিস্ময়কর আন্দোলন #নারী স্বাধীনতা #মোনাফেক #সাম্প্রদায়িকতা #তাকওয়া #৫ দফা কর্মসূচি