আদর্শিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি

সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গান

01 Apr, 2023 Super Admin 774 ভিউ
সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গান

প্রসঙ্গ কথা: সঙ্গীত সম্বন্ধে ইসলামের ইতিহাস কী বলে?

সঙ্গীত সর্বযুগে সর্বজাতির সংস্কৃতির অঙ্গ। আরবরাও এর বাইরে নয়। কিন্তু ইসলামপূর্ব আরবের সংস্কৃতিতে অনেকভাবে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। রসুল সেই সংস্কৃতি থেকে অশ্লীলতা পাপাচারকে বিদূরিত করলেন। আগেও গায়িকারা গান করত, সঙ্গে অশ্লীল নৃত্য ছিল অনুষঙ্গ। অর্থের বিনিময়ে তারা নাচগানের পাশাপাশি দেহব্যবসাও করত। কিন্তু ইসলাম অশ্লীলতাকে হারাম করেছে। সুতরাং সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ সমাজের সর্ব অঙ্গন থেকেই যাবতীয় অশ্লীলতা দূর করা হলো। রসুলের সময়ও মদীনায় বিয়ে শাদি বা কোনো দিবসকেন্দ্রিক উৎসবে গান হতো। তখন তো আজকের মতো এত সব বাদ্যযন্ত্র ছিল না, ছিল কেবল দফ জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। সেটা বাজিয়েই তারা অনুষ্ঠান করতেন। একটি বাদ্যযন্ত্র বৈধ হওয়ার অর্থ যে কোনো বাদ্যযন্ত্রই বৈধ।

জাহেলিয়াতের যুগে আরবে গান আর অশ্লীলতা ছিল একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। তাই অনেক সাহাবি গানকেও ফাহেশা কাজ বা মন্দ কাজ বলে ভাবতে লাগলেন। কিন্তু রসুলাল্লাহ তাঁদের এই ভুল ধারণা ভাঙিয়ে দিলেন। তিনি সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়ের সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ করলেন দক্ষ শল্যবিদের মতো। সঙ্গীতাঙ্গন থেকে বাদ দিলেন অশ্লীলতা, মিথ্যাচার ও আল্লাহর নাফরমানির অংশটুকু আর রেখে দিলেন সঙ্গীত, বাদ্য ও নির্মল বিনোদন। একটি ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিক।

রসুলাল্লাহর নারী সাহাবি রুবাই বিনতে মুআব্বিয ইবনু আফরা (রা.) বলেন, “আমার বাসর রাতের পরের দিন নবী (সা.) এলেন এবং আমার বিছানার ওপর বসলেন, যেমন বর্তমানে তুমি আমার কাছে বসে আছ। সে সময়ে মেয়েরা দফ বাজাচ্ছিল এবং বদর যুদ্ধে শাহাদাত প্রাপ্ত আমার বাপ-চাচাদের শোকগাঁথা গাচ্ছিল। তাদের একজন গাচ্ছিল, আমাদের মধ্যে এক নবী আছেন, যিনি ভবিষ্যৎ জানেন। তখন রসুলুল্লাহ্ বললেন, এ কথাটি বাদ দাও, আগে যা গাইছিলে তাই গাও (সহিহ বোখারী, হাদিস নং ৫১৪৭)।”

এখানে রসুলাল্লাহ মেয়েদেরকে গান গাইতে বারণ করলেন না, কিন্তু তাঁর ব্যাপারে একটি মিথ্যা ধারণা তিনি সংশোধন করে দিলেন। অর্থাৎ সঙ্গীত চলবে কিন্তু সঙ্গীতের কথায় মিথ্যার মিশ্রণও থাকা চলবে না।

রসুলাল্লাহ গান নিষিদ্ধ করেন নি, কারণ তিনি জানতেন মানুষের আত্মা আছে, সে পশু নয়। তার চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন আছে। এটা বন্ধ করলে অপ্রাকৃতিক হবে। কিন্তু মানব ইতিহাসের ব্যস্ততম এই পুরুষের পক্ষে গান নিয়ে, শিল্পচর্চা নিয়ে পড়ে থাকার সময় ছিল না। তবু অবসরে নিজ গৃহে অথবা যুদ্ধ থেকে ফিরে সাহাবীদের সঙ্গে তাঁকে গান শুনতে দেখা গেছে এমন হাদীস আমরা যথেষ্ট পরিমাণেই পাই। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে জানা যায়, একবার রসুলাল্লাহ কোনো এক সফরে যাচ্ছিলেন। জনৈক উট চালক উটের রশি ধরে হেঁটে যাচ্ছিল আর গান গাচ্ছিল। গান গেয়ে সে উটকে জোরে চলার জন্য অনুপ্রাণিত করছিল। উটের পিঠে আরোহী ছিলেন রসুলাল্লাহর স্ত্রীগল। স্ত্রীগণের উটটি রসুলাল্লাহর উটকে অতিক্রম করে যাচ্ছিল। তখন তিনি গায়ককে লক্ষ্য করে বললেন, আনযাশাহ! সাবধানে চলো; এই কাচের পাত্রদের সঙ্গে কোমল আচরণ করো। (মুসনাদে আহমদ, ৩:১৭২, ১৮৭, ২০২)। অর্থাৎ রসুলাল্লাহ একদিকে যেমন নারীদেরকে সর্ব অঙ্গনে কাজ করার যোগ্য করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন অপরদিকে নারীর সৃষ্টিগতভাবে পুরুষের তুলনায় দুর্বলতর শারীরিক কাঠামোর কথাও তিনি বিস্মৃত হননি।

সঙ্গীত চিরন্তন ও শ্বাশ্বত বিনোদনের মাধ্যম, তাই আরবের নারী-পুরুষ উভয়কেই সঙ্গীতচর্চা করতে দেখা গেছে। রসুলাল্লাহ যখন হেজরত করে মদিনায় এসে পৌঁছান তখন তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য আনসারগণ “তালা-আল বাদরু আলাইনা” গানটি গাইতে থাকেন। এই গানটি ১৪০০ বছরেরও বেশি পুরনো ইসলামি সংস্কৃতির একটি অনন্য নিদর্শন যা আজো গীত হয়।

আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে কোথাও গান ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করেন নি, আল্লাহর রসুলও গানবাদ্য হারাম এমন কথা বলেন নি। এগুলো হারাম করেছেন এক শ্রেণির অতি-বিশ্লেষণকারী পণ্ডিত। রসুলাল্লাহর জীবনে এমন অনেক ঘটনা আছে যে তিনি গান শুনেছেন। আম্মা আয়েশা (রা.) খুব সংগীতানুরাগী ছিলেন। তাঁর গৃহে রাসুলাল্লাহর (সা.) উপস্থিতিতেই সংগীত চর্চার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় হাদিস গ্রন্থগুলিতে। নারী সাহাবিদের সঙ্গীতচর্চা নিয়ে তিনটি হাদিস উল্লেখ করছি।

(ক) একবার আরবের একটি জাতীয় উৎসবের দিন ‘বুয়াস দিবস’- এ দুটো মেয়ে রসুলাল্লাহর ঘরে দফ ও তাম্বুরা বাজিয়ে গান গাইছিল। আম্মা আয়েশাও (রা.) গান শুনছিলেন। এমন সময় তাঁর পিতা আবু বকর (রা.) সেখানে আসেন এবং আম্মা আয়েশাকে (রা.) তিরস্কার করেন। তখন আল্লাহর নবী আবু বকরের (রা.) দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আবু বকর! তাদেরকে তাদের কাজ করতে দাও” (সহিহ বোখারী, হাদিস নং ৯৮৭)।

(খ) আয়েশা (রা.) একটি মেয়েকে লালন পালন করতেন। অতঃপর তাকে এক আনসারের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানস্থল থেকে আয়েশা (রা.) এর প্রত্যাবর্তনের পর রাসুলাল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন,“তুমি কি মেয়েটিকে তার স্বামী গৃহে রেখে এসেছো?” উত্তরে তিনি বললেন, “হ্যাঁ”। পুনরায় রাসুল (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি এমন কাউকে তাদের বাড়ি পাঠিয়েছ যে গান গাইতে পারে?” আয়েশা (রা.) বললেন, “না”। রাসুলাল্লাহ বললেন, “তুমি তো জান আনসাররা অত্যন্ত সংগীতপ্রিয়” (ইকদ আল ফরিদ)।

(গ) আবু বোরায়দা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী (স.) কোন একটি যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার সময় একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারী আসহাব মহানবী (স.) এর সামনে এসে বললেন যে- ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি মানত করেছিলাম যে, আপনাকে নিরাপদে আল্লাহ ফিরিয়ে আনলে আমি আপনার সামনে দফ বাজিয়ে গান গাইব।’ মহানবী (স.) বললেন, ‘যদি তুমি মানত করে থাক তাহলে বাজাও। মানত পুর্ণ কর। তারপর মেয়েটি দফ বাজিয়ে গান গাইতে লাগল।’ [তিরমিজি ২য় খণ্ডের ২০৯-২১০ পৃষ্ঠা, মেশকাত শরিফের ৫৫৫ পৃষ্ঠা ও আবু দাউদ শরিফ]।

এই ঘটনাগুলোতে কয়েকটি বিষয় ভাল করে লক্ষ করে দেখুন:

১. যে ঘরে গান হচ্ছে সেটি স্বয়ং রাসুলাল্লাহর ঘর, ২. ঘরে তিনি স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন, ৩. তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা.) সংগীত অনুরাগী ছিলেন, ৪. মেয়েগুলো বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান করছিলো, ৫. উৎসবের সাথে সম্পর্কিত গান তা কোনো ইসলামিক গজল ছিল না, ৬. বুয়াস দিবস অর্থাৎ আরবের কোনো জাতীয় দিবস। সেটাও ইসলামিক কোনো অনুষ্ঠান ছিলো না।

উপরোক্ত কোনো ঘটনাতেই স্বয়ং আল্লাহর রাসুল (সা.) সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রকে নিষিদ্ধ বা হারাম ঘোষণা করেন নি। বরং আবু বকর (রা.) ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও রাসুল (সা.) তাদেরকে গান চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। তবে এই সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রকে হারাম করল কারা? ইসলাম সুর-সংগীত ও বাদ্যযন্ত্রকে কখনই নিষিদ্ধ করে নি। নিষিদ্ধ করেছে অশ্লীলতা, নোংরামী এবং অন্যের ক্ষতি হয় এমন বিষয়কে। অশ্লীলতা নিশ্চয়ই কোনো ধর্মই সমর্থন দেয় না।

ট্যাগসমূহ:

মন্তব্য সমূহ (0)

বর্তমানে কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!

আপনার মতামত দিন

জনপ্রিয় ট্যাগ
#মামলার অব্যাহতি #গোলটেবিল বৈঠক #হাইকোর্টের রায় #অপপ্রচার #muchleka #কোরবানি কখন কবুল হবে? #হেযবà§�ত তওহীদ #ইসলামি ইতিহাস #উগ্রবাদ #গুজব #নারী #পর্দা #প্রকৃত ইসলাম #প্রকৃত ইসলামের নারী #হেযবুত তওহীদ #হেযবুত তওহীদের নারী #ইসলাম #নোয়াখালীত #বকধার্মিকতা #মন্তব্য কলাম #মন্তব্য কলাম বাড়ছে বকধার্মিকতা #কারা সেই জান্নাতি ফেরকা? #জান্নাতি #জান্নাতি ফেরকা #মুস্তাফিজ শিহাব #চলমান সঙ্কট #মুখলেছুর রহমান সুমন #রাজনৈতিক ইসলাম #ধর্ম নিয়ে ঘৃণার রাজনীতি #রামমন্দির ও থার্ড টেম্পল #ইসলামের অপব্যাখ্যা #জাতি ভেঙে খানখান #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি #দীন নিয়ে বাড়াবাড়ির #ধর্ম #পরিণাম জাতি ভেঙে খানখান #ফেরেশতা #মানুষ সৃষ্টির #মো’জেজা: কী কেন কীভাবে? #পহেলা বৈশাখ #সংস্কৃতির #সাংস্কৃতিক অঙ্গন #আমল #ঈমান #আদিবা ইসলাম #এমামুযযামান #রিয়াদুল হাসান #লা’নত নাকি পরীক্ষা #লানত #কাঁটাতারে ব্যর্থ #বিশ্বভ্রাতৃত্বের #মুসলিম #রোড টু ফিলিস্তিন #নামাজ #নামাজ কেন পড়ছেন? #মোহাম্মদ আসাদ আলী #ধর্মজীবিকা #ধর্মবিশ্বাসী #শিক্ষাব্যবস্থা #অশান্তি সৃষ্টির কারণ #এম আর হাসান #চরিত্রহীন নেতৃত্ব #বস্তুবাদী সভ্যতা #বাস্তব সমস্যা #মহানবীর (সা.) #দেশকে রক্ষা #বিশ্ব মুসলমান #মদিনার #রাকীব আল হাসান #মাননীয় এমাম #হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম #ইসলামের ইতিহাস #মো’মেনদের #দাজ্জাল #দাজ্জালকে চিনতে হবে #ধর্মব্যবসা #উম্মতে মোহাম্মাদি #তওহীদ #মো’জেজা: #মুসলিমরা আজ সংকটের সম্মুখীন #খলিফা #দীন প্রতিষ্ঠা #দীনের মূল ভিত্তি #লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ #সেরাতুল মোস্তাকিম #২৯ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী #civilized’ #deterrent #islam world #world #জীবনব্যবস্থা #প্রশ্ন উত্তর #প্রশ্নোত্তর #হেযবুত তওহীদের #hezbuttawheed #hossain mohammad salim #Resolving the Global Crisis #Students #ঐক্য ##MarathonHT #Marathon #lifestyle #ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যের আহ্বান #workplace #religious extremists #democratic system #economic system #politics #Allah #Aqeedah of islam #God #Haj #Jihad #Kital #Prophet Muhammad #terrorism #কোরবানি #ত্যাগ #বজ্রশক্তি #সম্পাদক এসএম সামসুল হুদা #সাক্ষাৎকার #হেযবুত তওহীদের বিজয় #রসুলুল্লাহর সুন্নাহ #দাসপ্রথার #জঙ্গিবাদ #আইয়্যামে জাহেলিয়াত #জেহাদ #দোয়া #সঠিক জীবন ব্যবস্থা #জ্ঞান #বাণী #ইমাম মাহদী #কবিতা #রাজনীতি #মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা #আশুরা #শহীদ #প্রকৃত ইসলামের মসজিদ #মসজিদে নারী #দাউদ খান পন্নী #ঔপনিবেশিক যুগ #সংগীত #স্বাধীনতা #খোলাফায়ে রাশেদীন #যোদ্ধাসুফি #স্বর্ণযুগের মোল্লাতন্ত্র #মানুষ সৃষ্টি #প্রকৃত ইসলামের বিয়ে #বাংলার সুলতানী যুগ #গণমাধ্যম #মহামান্য এমামুযযামানের জীবনবৃত্তান্ত #ইসলাম অর্থ #শান্তি #পাকিস্তান #দৈনিক বজ্রশক্তি #খেলাধুলা #আইনের উৎস #নির্বাচন #সংস্কৃতি #জ্ঞান-বিজ্ঞান #মহানবীর লড়াই #হজ #সাম্যবাদ ও ইসলাম #বাংলাদেশ #কোর’আন #শিক্ষা #নবুয়তপূর্ব জীবন #ইসলামবিদ্বেষী #ইতিহাস ও ইসলাম #চরমোনাই #ওমর (রা.) #তারেক বিন যিয়াদ #কর্মফল #পুঁজিবাদ #মার্কস #হারাম #সুফিবাদ #বাঙালি #মানবজীবন #মুসলিমদের ইতিহাস #প্রশ্ন #রাগ #আকিদা #কমিউনিজম #জান্নাত-জাহান্নাম #মণীষীদের জীবনী #মধ্যযুগীয় বর্বরতা #স্বর্ণযুগ #গণজোয়ার #গণপ্রতিরোধ #তওহীদী জনতা #কর্মজীবন #ইসলাম আবির্ভাব #ইসলামের বিস্তৃতি #অর্থনীতি #রিজিক #বিস্ময়কর আন্দোলন #নারী স্বাধীনতা #মোনাফেক #সাম্প্রদায়িকতা #তাকওয়া #৫ দফা কর্মসূচি